কক্সবাজারের জন্য দরকার মহাপরিকল্পনা:
‘কক্সবাজারের টেকসই উন্নয়ন: আজ ও আগামীর ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে প্রথম আলো ও কোস্ট ফাউন্ডেশন।
কক্সবাজার ২০ জানুয়ারি ২০২৬: সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, নদীসহ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর পর্যটন শহর কক্সবাজার অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে মাদক, যানজট, বর্জ্য অব্যবস্থাপনা, সমুদ্র ও পরিবেশদূষণ সমস্যায় ভুগছে। যদি পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে দেশের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদেরও আকর্ষণে পরিণত হবে কক্সবাজার। এ জন্য দরকার মহাপরিকল্পনা।
গতকাল সোমবার ‘কক্সবাজারের টেকসই উন্নয়ন: আজ ও আগামীর ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথাগুলো বলেন। কক্সবাজারের কলাতলীর সায়মন রিসোর্টে যৌথভাবে এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে প্রথম আলো ও বেসরকারি সংস্থা কোস্ট ফাউন্ডেশন।
গোলটেবিল বৈঠকে রাজনীতিবিদ, সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) কর্মকর্তা, গণমাধ্যমকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বক্তারা কক্সবাজারের পর্যটনশিল্প, যানজট, সুপেয় পানির সংকট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীরকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়া, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনসহ বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
কক্সবাজারে রয়েছে ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত। গোলটেবিল বৈঠকে সমুদ্রসৈকত ও পর্যটনশিল্প নিয়ে কথা বলেন অধিকাংশ বক্তা।
কেন্দ্রীয় বিএনপির মৎস্যজীবীবিষয়ক সম্পাদক ও কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকতের মধ্যে পরিকল্পিত হোক, অপরিকল্পিত হোক চার–পাঁচ কিলোমিটার সাজানো হয়েছে। বাকি সমুদ্রসৈকত কীভাবে সুন্দর করে সাজানো যায়, তার পরিকল্পনা করা দরকার।
কক্সবাজারের সম্ভাবনা নিয়ে বলতে গিয়ে লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, কক্সবাজারের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু করা দরকার। ভৌগোলিক অবস্থান ও সমুদ্রসৈকত থাকার কারণে সরকার ইতিবাচক হলে এখানে বিনিয়োগ আসবে। কিন্তু এখানে কেউ কিছু করতে চাইলে নীতিনির্ধারকেরা সব কঠিন করে ফেলেন। পরিবেশের কথা যেমন ভাবতে হবে, তেমনি গরিব মানুষের জীবিকার কথা ভাবতে হবে।
কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খাঁন বলেন, কক্সবাজারের পর্যটনের মান কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক মানের নয়। এখানে বিদেশি পর্যটক আসেন না। কক্সবাজারকে পর্যটন নগর হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। পর্যটনশিল্প বিকাশের ত্রুটি, দুর্বলতা ও সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা দরকার। উন্নত মানের পর্যটন নগর গড়ে তুলতে যা যা দরকার, তা নিয়ে মহাপরিকল্পনা করা দরকার।
কক্সবাজার জেলা জামায়াতের আমির ও কক্সবাজার–৪ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী নুর আহমদ আনোয়ারী বলেন, ‘পাহাড়–সমুদ্র–নদীসহ কক্সবাজারে যে প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, তা পৃথিবীর কোথাও নেই। এগুলো যদি পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যায় তাহলে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারব।’
কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এম রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) নামে একটা সংগঠন আছে। আমার অনেক বড় প্রশ্ন আছে, কক্সবাজার নিয়ে কউকের কোনো মহাপরিকল্পনা আছে কি না? এ মহাপরিকল্পনা করার সময় অবশ্যই সাধারণ মানুষের মতামত নিতে হবে। আর এমনভাবে মহাপরিকল্পনা করতে হবে, যাতে মেরিন ড্রাইভের দিকে আর জনবসতি না হয়।
ভবিষ্যতে কক্সবাজারে সুপেয় পানির বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি।
মহাপরিকল্পনা না থাকার কারণে কক্সবাজারের বড় ক্ষতি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন জামায়াতে ইসলামীর কক্সবাজার শহর শাখার আমির ও কক্সবাজার–১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুখ। তিনি বলেন, যানজটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। হোটেল–মোটেল হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। নিরাপত্তার সমস্যা রয়েছে। এভাবে তো একটি পর্যটন শহর গড়ে উঠতে পারে না। কিন্তু গড়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করতে হবে।
কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি ও কক্সবাজার–৪ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী বলেন, কক্সবাজারের পরিকল্পিত উন্নয়ন করতে হলে কউকে যোগ্য মানুষ দিতে হবে। যাঁর সঙ্গে সাধারণ মানুষের ভালো বোঝাপড়া থাকবে। পর্যটনশিল্পের বিকাশের আগে এখানকার স্থানীয় মানুষদের পর্যটনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার জন্য জোর দেন তিনি।
কক্সবাজার জেলা জামায়াতের আমির ও কক্সবাজার–৪ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী নুর আহমদ আনোয়ারী বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এখন মহাপরিকল্পনা করা হলেও তা বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন হয়ে পড়বে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ১০০ কিলোমিটার অংশ উখিয়া–টেকনাফে। যদি এই অংশের জন্য মহাপরিকল্পনা করা না হয়, তাহলে কক্সবাজার শহরের যে পরিণতি হয়েছে, টেকনাফ–উখিয়ার সে পরিণতি হবে।
কক্সবাজার উন্নয়ন মানে দেশের উন্নয়ন বলে মন্তব্য করেছেন কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক ও জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. শামীম আল ইমরান। তিনি বলেন, এখানে উন্নয়ন দরকার। তবে একই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র সরওয়ার কামাল বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে পদক্ষেপ নিতে হবে। শহরে চলাচলরত টমটম ও ইজিবাইকের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। যাত্রী ও পর্যটকদের জন্য শহর বাস চালু করতে হবে। পর্যটকদের জন্য শিশুপার্ক, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, ফিশ অ্যাকুয়ারিয়াম করতে হবে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য পর্যটকদের সামনে তুলে ধরতে হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)–এর কক্সবাজার শাখার সভাপতি অধ্যাপক অজিত দাশ বলেন, কক্সবাজারে পান, সুপারি এবং লবণ শিল্প—তিনটি আজ হুমকির সম্মুখীন। এসব শিল্পে পৃষ্ঠপোষকতা বা সরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। টেকনাফে যে স্থলবন্দর রয়েছে তা মান্ধাতা আমলের। এটির সংস্কার প্রয়োজন।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস বলেন, যতই উন্নয়ন করা হোক না কেন, নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে সে উন্নয়ন টেকসই হবে না। অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়, সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থার বিষয় প্রাধান্য দেওয়া হয় না।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের ১৩টি ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্যাল এরিয়ার (পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা) মধ্যে তিনটি ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্যাল এরিয়া হচ্ছে কক্সবাজারে। তিনটির মধ্যে সোনাদিয়া ও সেন্ট মার্টিন পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। এগুলো সংরক্ষণ করতে হবে।
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবর রহমান, প্রথম আলোর আঞ্চলিক সম্পাদক তুহিন সাইফুল্লাহ ও কক্সবাজারের নিজস্ব প্রতিবেদক আব্দুল কুদ্দুস। গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।




