এম রেজাউল করিম চৌধুরী, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
যদি কেউ মনে করেন যে, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কিংবা রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমে ইউএনএইচসিআর বর্তমানে যে নেতৃত্বমূলক অবস্থানে রয়েছে, তা শুধুমাত্র জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর একক প্রচেষ্টার ফল, তাহলে এই ধারণাটি ভুল হবে। কারণ, তাহলে কক্সবাজারের নাগরিক সমাজের রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমে যে দীর্ঘদিনের অবদান, তাকে অগ্রাহ্য করা হবে। দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন ফোরামে কক্সবাজারের নাগরিক সমাজ এবং স্থানীয় এনজিওগুলোর ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই এটি সম্ভব হয়েছে।
কক্সবাজারের স্থানীয় এনজিও প্রতিনিধিরা ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড হিউম্যানিটারিয়ান সামিট (World Humanitarian Summit), ২০১৬ সালের মে মাসে ইস্তাম্বুলে গৃহীত গ্র্যান্ড বার্গেইন ঘোষণা (Grand Bargain Declaration) এবং ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রবর্তিত চার্টার ফর চেঞ্জ (Charter for Change) এর সঙ্গে ভালোভাবেই পরিচিত। এদের মধ্যে কয়েকজন এসব ইস্যুভিত্তিক আয়োজিত বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সম্মেলনেও অংশ নিয়েছেন। রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমে স্থানীয়করণ প্রক্রিয়া সংযোজনের দাবি উপস্থাপিত হয়েছে স্থানীয় বাস্তবতার নিরিখেই। তবে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সঙ্গে বিশেষ করে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার মাধ্যমেও এই প্রক্রিয়া এগিয়ে গেছে। এখানে মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গাদের আগমনের প্রথম ৪০ দিন জাতিসংঘের কোনো সংস্থা কিংবা আন্তর্জাতিক এনজিও কেউই সাড়াদান কার্যক্রমে এগিয়ে আসেনি। সেইসময় শুধুমাত্র স্থানীয় এনজিও, স্থানীয় সরকার এবং বিশেষ করে স্থানীয় জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রয়োজনীয় খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিল।
আমার মনে আছে, ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে কক্সবাজারের হোটেল ওশন প্যারাডাইসে জাতিসংঘের জরুরি ত্রাণবিষয়ক সমন্বয়কারী মার্ক লো ককের (Mark Low Cock) সঙ্গে আমার প্রথম মিটিং হয়েছিল। সেই মিটিং-এ ব্যাংকক থেকে আসা OCHA-এর একজন কর্মকর্তা এবং অল্প কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। আমি ও আবু মোরশেদ চৌধুরী স্থানীয় এনজিওগুলোর প্রতিনিধিত্ব করেছিলাম। আলোচনায় স্থানীয় এনজিওগুলোর কার্যকর অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরি। এ বিষয়ে প্রতিবেদনটি দেখতে নিচের লিংকে যান: https://cxb-cso-ngo.org/2017/10/05/coxs-bazar-local-ngos-and-csos-demand-to-chief-of-ocha-under-secretary-general-mr-mark-un-agencies-must-abandon-direct-operation-single-handle-and-monopolistic-approach-too/
২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের আগমন শুরুর পর থেকেই জাতিসংঘের সংস্থাগুলো স্থানীয় এনজিওগুলোকে এই সাড়াদান কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা শুরু করে। এখানে স্থানীয় এনজিও বলতে সেসব এনজিওকে বোঝানো হয়েছে, যেগুলোর নেতৃত্ব ও উৎপত্তি কক্সবাজারেই। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো স্থানীয় এনজিও প্রতিনিধিদের তাদের আয়োজিত বিভিন্ন সভাগুলোতে আমন্ত্রণ জানাতে শুরু করে। একই সময়ে ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী (United Nations Resident Coordinator-UNRC) স্ট্র্যাটেজিক এক্সিকিউটিভ গ্রুপ (Strategic Executive Group-SEG) নামে একটি সমন্বয় কাঠামো গঠন করেন। কক্সবাজারে জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের অনুরোধে কক্সবাজারের স্থানীয় এনজিওগুলোর প্রতিনিধিত্ব করার জন্য একজন এনজিও প্রতিনিধিকে এসইজিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী এবং বিশেষ করে দাতা সংস্থাগুলো স্থানীয়করণের বিষয়ে অত্যন্ত আগ্রহী ছিল। তাদের কাছে স্থানীয়করণের অর্থ ছিল, রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে স্থানীয় এনজিওগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকবে। আমরা তাঁর অনুরোধে প্রথমে কানাডীয় দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এবং পরে ঢাকায় অফিস আছে এমন সব দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক এক করে মিটিং করি। ২০১৭ সালের শেষের দিকে আমি, পালসের আবু মোরশেদ চৌধুরী, হেল্পের আবুল কাশেম, জাগো নারী উন্নয়ন সংস্থার শিউলি শর্মা এবং নোঙরের রাশেদ তাঁদের সঙ্গে এই মিটিংগুলো করেছিলাম। এসব আলোচনায় সভায় দাতা সংস্থা ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলো কিভাবে স্থানীয়করণ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে পারে, সে বিষয়ে আমরা একটি প্রাথমিক রূপরেখা তাদের সামনে তুলে ধরি।
কিন্তু আমরা কখনই গ্র্যান্ড বার্গেইন, চার্টার ফর চেঞ্জ এবং স্থানীয়করণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির প্রচেষ্টা থেকে সড়ে আসিনি। এ লক্ষ্যেই আমরা কক্সবাজার সিএসও-এনজিও ফোরাম (Cox’s Bazar CSO-NGO Forum-CCNF) নেটওয়ার্কটি গঠন করি। সেখানে আমি, পালসের আবু মোরশেদ চৌধুরী এবং মুক্তির বিমল দে এই নেটওয়ার্কের কো-চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এসব বিষয় নিয়ে, বিশেষ করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সামাজিক সংহতি এবং স্থানীয়করণ এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে আমরা কক্সবাজার ও ঢাকায় ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকটি উন্মুক্ত পরামর্শ সভার আয়োজনও করেছি। জাতিসংঘ ও সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এসব সভায় অংশগ্রহণ করেন। প্রতিবেদনগুলো দেখতে ভিজিট করুন: www.cxb-cso-ngo.org এ বিষয়ে ২০১৮ সালের মার্চ মাসে আয়োজিত একটি সেমিনারের প্রতিবেদনও নিচের লিংকে দেখা যাবে: https://cxb-cso-ngo.org/2018/03/03/urging-un-agencies-and-ingos-to-fulfill-international-commitments-in-rohingya-relief-reduce-transaction-cost-ensure-accountability-and-partnering-with-local-organization/
প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল সারকারের কাছে জোরালোভাবে আমাদের দাবি তুলে ধরা, যেন রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব ইউএনএইচসিআরকে দেওয়া হয় এবং রোহিঙ্গাদের তথাকথিত “জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক” হিসেবে যেন বিবেচনা না করা হয়। এজন্য আমাদের কক্সবাজার ও ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারাভিযানের আয়োজন করতে হয়েছিল। এ বিষয়ে আমাদের অবস্থানপত্রের ‘ডি’ ও ‘ই’ (D&E) অংশ দেখতে নিচের লিংকটি ব্যবহার করুন: https://www.cxb-cso-ngo.org/wp-content/uploads/2017/11/English-position-paper-for-the-press-conference_Dhaka_09-November-2.pdf
এ ধরনের আরও কয়েকটি অনুষ্ঠান আমরা কক্সবাজার, ঢাকা, ব্যাংকক এবং নিউইয়র্কে আয়োজন করি। এসব উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক সংহতি বাড়ানো, রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমে ইউএনএইচসিআরের ভূমিকা শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা। ২০১৭ সাল থেকে প্রতি বছর ২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে সিসিএনএফ ও কোস্ট যৌথভাবে বিভিন্ন জায়গায় উন্মুক্ত অনুষ্ঠান ও সমাবেশের আয়োজন করে আসছে। এ বিষয়ে প্রতিবেদনটি দেখতে নিচের লিংকে যান: https://cxb-cso-ngo.org/2021/08/16/world-refugee-day-together-we-heal-learn-and-shine/
১৬ মে ২০১৯, এসইজির একটি সভায় ইউএনএইচসিআর, অক্সফাম, সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউএনডিপি, কোস্ট এবং পালসের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি লোকালাইজেশন টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। ইউএনডিপিকে এই টাস্কফোর্সের সচিবালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। টাস্কফোর্সের ToR সম্পর্কে জানতে নিচের লিংকে পাওয়া যাবে: https://www.cxb-cso-ngo.org/wp-content/uploads/2021/08/5.-ToRs-for-Localization-in-CXB-Task-Force-as-endorsed-16-May-2019.pdf
টাস্কফোর্সের পক্ষ থেকে ব্যারিস্টার মঞ্জুর হাসানের নেতৃত্বাধীন সেন্টার অব গভর্ন্যান্স, পিস অ্যান্ড জাস্টিসকে, একটি স্কোপিং স্টাডি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এটি ২০২০ সালের জুন মাসে সম্পন্ন হয়। ওই স্টাডির ফলাফলের উপর ভিত্তি করে এসইজির কো-চেয়াররা, যাঁদের মধ্যে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী, আইওএমের প্রধান এবং ইউএনএইচসিআর, একটি আনুষ্ঠানিক নোট ইস্যু করেন। নোটটি নিচের লিংকে দেখা যাবে: https://www.cxb-cso-ngo.org/wp-content/uploads/2021/08/3.-SEG-Co-Chairs-Localization-Note-June-2021.pdf
এর উপর ভিত্তি করে সকল পর্যায়ে নিবিড় আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে এবং বাস্তবায়নযোগ্য এবং পরিমাপযোগ্য সূচকগুলোকে মাতায় রেখে একটি স্থানীয়করণ রোডম্যাপ (Localization Roadmap) প্রণয়ন করা হয়। স্থানীয়করণ রোডম্যাপের সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন (সেপ্টেম্বর ২০২০) নিচের লিংকে পাওয়া যাবে: https://www.cxb-cso-ngo.org/wp-content/uploads/2021/08/2.-Localisation-Roadmap_Summary-compressed.pdf
এছাড়া, এই রোডম্যাপের বিষয়ে এসইজির কো-চেয়ারদের অনুমোদনসংক্রান্ত নোটটি নিচের লিংকে দেখুন: https://www.cxb-cso-ngo.org/wp-content/uploads/2021/08/1.-Subtract-from-8th-July-on-Localizastion.pdf
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে গ্র্যান্ড বার্গেইনের একটি মিশন জেনেভা থেকে বাংলাদেশে আসে। মিশনটি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটি নিচের লিংকে পাওয়া যাবে: https://interagencystandingcommittee.org/grand-bargain/mission-report-bangladesh-localization-workstream-demonstrator-country-field-mission
বাংলাদেশে গ্র্যান্ড বার্গেইনের স্থানীয়করণ সংক্রান্ত অঙ্গীকারসমূহ বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়ন মিশন:
আট বছর আগে, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে, গ্র্যান্ড বার্গেইনের স্থানীয়করণ-সংক্রান্ত অঙ্গীকারগুলো, বিশেষ করে রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রম এবং দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোতে, কিভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা মূল্যায়নের জন্য বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত একটি মিশন বাংলাদেশ সফর করে। মিশনে দাতা সংস্থা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক এনজিও, রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট মুভমেন্ট, সরকারি প্রতিনিধি এবং স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের এনজিওগুলো অংশ নিয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় নেতৃত্বাধীন মানবিক সহায়তা কার্যক্রম আরও জোরদার করার জন্য বিদ্যমান ভালো চর্চা, প্রতিবন্ধকতা এবং বাস্তবসম্মত সুপারিশগুলো চিহ্নিত করা।
মিশনটি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের অংশীজনদের নিষ্ঠা ও সক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেয়। তবে বৈশ্বিক অঙ্গীকার এবং মাঠপর্যায়ে সেগুলোর বাস্তবায়নের মধ্যে দীর্ঘদিনের একটি ব্যবধানও চিহ্নিত করে। নীতিগতভাবে স্থানীয়করণের প্রতি ব্যাপক সমর্থন থাকলেও আন্তর্জাতিক অংশীজনেরা প্রায়ই বিষয়টিকে মূলত প্রকল্প বাস্তবায়নের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতেন। স্থানীয় নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং ন্যায্য অংশীদারত্বের ওপর তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হতো। প্রতিবেদনে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের মধ্যে দ্বিমুখী সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্থানীয় এনজিওগুলোর জন্য সরাসরি অর্থায়ন বৃদ্ধি, নারীনেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ জোরদার এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আহবান জানানো হয়। এছাড়া, যেখানে সম্ভব, সেখানে মানবিক সাড়াদান কার্যক্রমের নেতৃত্ব ধীরে ধীরে স্থানীয় পর্যায়ে হস্তান্তরের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনটি আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে অর্থায়ন কমে যাওয়ার পাশাপাশি চাহিদা বাড়তে থাকায়, ২০১৮ সালে যেই সুপারিশগুলো করা হয়েছিল সেগুলো মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে আরও টেকসই, জবাবদিহিমূলক ও স্থানীয় নেতৃত্বনির্ভর করার জন্য বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা দেয়। প্রতিবেদনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্থানীয়করণ মানে শুধু বাস্তবায়নের দায়িত্ব স্থানীয় সংগঠনগুলোর কাছে হস্তান্তর করা নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছাকাছি থাকা ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর সঙ্গে নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং সম্পদ ভাগ করে নেওয়া।
মানবিক কার্যক্রমে স্থানীয় ও জাতীয় নেতৃত্ব, ন্যায্য অংশীদারত্ব, অর্থায়নের যথাযথ বন্টন এবং এমন সমন্বয় ব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষ্যে, যা স্থানীয় ও জাতীয় অংশীজন, বিশেষ করে নারী নেতৃত্বাধীন এনজিও, আশ্রয়দাতা ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। মিশন টিম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ প্রস্তাব করে: (১) প্রাতিষ্ঠানিক দাতা সংস্থা ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী, (২) জাতিসংঘের সংস্থা ও আন্তর্জাতিক এনজিও, (৩) স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের অংশীজন এবং (৪) বাংলাদেশ সরকার। এসব সুপারিশের উদ্দেশ্য হলো মানবিক কার্যক্রমে স্থানীয় ও জাতীয় নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা শক্তিশালী করার সুযোগগুলো চিহ্নিত করা।
আমরা মানবিক সহায়তা, স্থানীয়করণ এবং রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমে নিয়োজিত সহকর্মীদের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনটি পুনরায় পাঠের আহ্বান জানাই। প্রকৃত অংশীদারত্ব ও স্থানীয় নেতৃত্বের মাধ্যমে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে আরও কার্যকরভাবে সেবা প্রদান করা যায়, সে বিষয়ে চলমান আলোচনায় প্রতিবেদনটির শিক্ষণীয় দিকগুলো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
কক্সবাজারে মানবিক সাড়াদান কার্যক্রমের জন্য স্থানীয়করণ রোডম্যাপ:
২০২০ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস (সিপিজে), লোকালাইজেশন টাস্কফোর্সের সহায়তায় একটি “কক্সবাজারে মানবিক সাড়াদান কার্যক্রমের জন্য স্থানীয়করণ রোডম্যাপ” (Localisation Roadmap for Humanitarian Response in Cox’s Bazar) প্রণয়ন করে। ২০১৮ সালের গ্র্যান্ড বার্গেইন মাঠ পর্যায়ের প্রাপ্ত মিশনের ফলাফলের ভিত্তিতে তৈরিকৃত এই রোডম্যাপে এটা বিশ্লেষণ করা হয়, কিভাবে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের নেতৃত্ব, সমন্বয়, অর্থায়ন এবং অংশীদারত্বের কাঠামো পুনর্গঠন করে রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের অংশীজনদের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আনা যায়।
রোডম্যাপে আরও স্বীকার করা হয় যে, স্থানীয় এনজিওগুলোর রয়েছে প্রাসঙ্গিক জ্ঞান, দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার এবং তদের প্রতি কমিউনিটির গভীর আস্থা। তা স্বত্ত্বেও নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সরাসরি অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা এখনো বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। ২০১৮ সালের মিশন প্রতিবেদনের সঙ্গে মিল রেখে রোডম্যাপটিতে জোর দিয়ে বলা হয় যে, স্থানীয়করণের অর্থ শুধু বাস্তবায়নকারী অংশীদারের সংখ্যা বাড়ানো নয়। এর অর্থ হলো নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা, ন্যায্য অংশীদারত্ব জোরদার করা, পারস্পরিক সক্ষমতা বিনিময়ে বিনিয়োগ করা এবং স্থানীয় অংশীজনদের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। কক্সবাজারে কার্যকর স্থানীয়করণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে প্রতিবেদনটিতে (১) প্রাতিষ্ঠানিক দাতা সংস্থা, (২) জাতিসংঘের সংস্থা ও আন্তর্জাতিক এনজিও, (৩) স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সংগঠন এবং (৪) বাংলাদেশ সরকারের জন্য কয়েকটি বাস্তবসম্মত সুপারিশও তুলে ধরা হয়।
বর্তমানে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন কমে আসছে এবং রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রম একটি কঠিন অধ্যায়ের সম্মুখীন হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রোডম্যাপটি এখনও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এর সুপারিশগুলো এমন একটি আরও টেকসই, জবাবদিহিমূলক ও ব্যয়-সাশ্রয়ী মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার একটি বাস্তবসম্মত পথনির্দেশনা দেয়, যেখানে স্থানীয় নেতৃত্ব, যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রকৃত অংশীদারত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। স্থানীয়করণকে শুধু একটি নীতিগত আকাঙ্ক্ষা হিসেবে নয়, বরং বাস্তবে কার্যকর করার ওপরই এই রোডম্যাপের মূল গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
আমরা মানবিক সহায়তা, স্থানীয়করণ এবং রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমে নিয়োজিত সহকর্মীদের “স্থানীয়করণ রোডম্যাপ” প্রতিবেদনটি পুনরায় বিবেচনার আহবান জানাই। ২০২০ সালে চিহ্নিত অনেক চ্যালেঞ্জ আজও বিদ্যমান রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখিত সুপারিশসমূহ এখনও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী। স্থানীয়করণের অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এবং স্থানীয় নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এই রোডম্যাপ গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে।



